
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের জলপাইগুড়ি বিভাগের কোচবিহার জেলা থেকে এক কিশোর এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া উপজেলার লোকমানপুর রেলস্টেশনে। ওই কিশোরের নাম তামিম খান(১৪)। তবে কিভাবে সে এদেশে প্রবেশ করলো, তা বলতে পারছে না বাকশক্তি হারানো ওই কিশোর। তবে খাতায় লিখে কিছু কথা জানানোর চেষ্টা করছে সে।
তার খাতায় লেখা ভাষ্য থেকে জানা যাচ্ছে, অচেতন অবস্থায় তাকে ভারত সীমান্ত পার করে দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে ট্রেনে চেপে সে নাটোর পর্যন্ত এসেছে।
গত ১০ই এপ্রিল থেকে কিশোর তামিম বাগাতিপাড়ার লোকমানপুর রেলস্টেশনে অবস্থান করছেন৷ ১১ই এপ্রিল তামিমকে এই স্টেশনে দেখতে পান স্থানীয়রা। প্রথমে তাকে কপর্দকশূন্য ও ভিখিরি মনে করেন অনেকে। পরে তামিমের ইশারায় কেউ কেউ তার কাছে যান ও বুঝতে পারেন প্রতিবন্ধী এই কিশোর ভিখিরি নন৷
অসহায় ও প্রতিবন্ধী কিশোরের তামিমের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় কিছু তরুণ। লোকমানপুর স্টেমনের প্ল্যাটফর্মে তার থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন তাঁরা। ওই তরুণরা তামিমকে দিয়েছেন খাবার, পোষাক এমনটি ভর দিয়ে চলাচলের লাঠিও।
কিশোর তামিমের সেবায় নিয়োজিত তরুণদের একজন আশরাফুল আলী নোমান তামিমের লেখার বরাত দিয়ে বলেন, ‘গত ১০ এপ্রিল সকালে রেলস্টেশন সংলগ্ন রাস্তায় এক কিশোরকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাক শক্তিহীন ছেলেটি হাঁটতে না পাররেও আমাদের কথাগুলো শুনতে ও বুঝতে পারছিল। প্রথমে মনে নানা প্রশ্নের জন্ম নিলেও পরে আমরা কয়েকজন তামিমকে রাস্তা থেকে প্ল্যাটফর্মে তুলে এনে গোসল করাই। খাবারের ব্যবস্থা করে একজন চিকিৎসককে খবর দিই। ওইদিনই প্লাটফর্মে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। পরদিন তামিম কিছুটা সুস্থ হলে আমরা তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্ত সে কথার উত্তর না দিয়ে ইশারায় কিছু লিখতে চায়। তাকে কাগজ-কলম দেয়া হলে স্পষ্টভাবে লিখে জানায় তার নাম তামিম খান। তার বাবার নাম বিল্লাল খান। বাড়ি ভারতের মেদিনীপুরে। বাবা বিল্লাল খান ব্যবসার জন্য কোচবিহারে থাকতেন। সেখানে সে মা–বাবার সঙ্গে থাকতো ও একটি স্কুলে লেখাপড়া করতো। হঠাৎ অসুস্থ হলে মায়ের মৃত্যু হয় এবং বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন।
তামিম লিখে আরও জানায়, সৎ মা ও ভাই-বোনেরা তাকে সহ্য করতেন না। সম্প্রতি বাবা বিল্লাল খানের মৃত্যু হলে তার উপর অত্যাচার শুরু হয়। একদিন দুপুরে তাকে তরল কিছু খাওয়ানো হলে সে জ্ঞান হারায়। এরপর সে নিজেকে লোকমানপুর রেলস্টেশনে আবিস্কার করে।
স্থানীয় লোকমানপুর বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, অসহায় কিশোরের তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করেছেন তারা। নিয়মিত খাবারের পাশাপাশি প্রতি সন্ধ্যায় তাকে ইফতারি দেয়া হচ্ছে।
তামিমের তত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা আশরাফুল আলী নোমান বলেন, ‘তামিম জানিয়েছে নিজ দেশে সে ফিরে যেতে চায় না। সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়ায় বাবার মৃত্যুর পর তাকে বঞ্চিত করার জন্য সৎ মা-ভাই তাকে অচেতন করে এদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।’
বাগাতিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেন, ‘স্থানীয় লোকজনের কাছে তামিমের বিষয়ে জেনেছি। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানো হয়েছে।’
বাগাতিপাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অহিদুল ইসলাম জানান, কিশোর তামিমকে নিয়ে কি করা যায়, তা ঠিক করা হবে। যেহেতু সে বাংলাদেশের কেউ না বলে নিজেই জানাচ্ছে, সেহেতু দ্রুত আমরা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। তবে এখানে আপাতত তার থাকা-খাবারের কোন অসুবিধা হবে না।’
© স্বত্ত্বঃ নাটোর টাইমস: ২০১৭-২০২৪ --- “নাটোর টাইমস” এ প্রকাশিত/প্রচারিত যেকোন সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও বা ভিডিওচিত্র বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং নিষিদ্ধ।
Leave a Reply